অনলাইন ডেস্ক: আস্থা নিউজ
মাঠের সবুজ ঘাসে যখন তাঁর পায়ে বল ওঠে, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। মাত্র কয়েক বছর বয়সেই বিশ্বফুটবলের আলো কেড়ে নেওয়া স্প্যানিশ তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামালকে নিয়ে উন্মাদনার শেষ নেই। সম্প্রতি এক সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, “এত কম বয়সে পুরো স্পেন জাতীয় দলের ভার কাঁধে নিয়ে ম্যাচ খেলার এই বিশাল চাপ তুমি কীভাবে সামলাও?”
মুচকি হেসে ইয়ামালের উত্তরটা ছিল চোখ খুলে দেওয়ার মতো:
“আমার মা যখন আমাকে জন্ম দেন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। ওটাই আসল চাপ! আর আমার বাবা পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করতে রাস্তায় পড়ে থাকা জিনিস কুড়িয়ে আনতেন—সেটা হলো চাপ। আমার কাজ তো স্রেফ একটা ফুটবল নিয়ে খেলা!”
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী ইয়ামালের মাঠের পারফরম্যান্স দেখে হাততালি দেন, কিন্তু এই বিশ্বসেরা বিস্ময়বালকের পেছনের গল্পটা একেবারেই ভিন্ন।
নামে জড়ানো এক ঋণের স্মৃতি Reddit
লামিনের জন্মের আগে তাঁর কিশোর মা-বাবা চরম আর্থিক অনটনে দিন কাটাচ্ছিলেন। এমনকি মাথার ওপরের ছাদটুকু বাঁচানোর জন্য বাড়িভাড়ার টাকা দেওয়ার সামর্থ্যও তাঁদের ছিল না। ঠিক সেই কঠিন সময়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন তাঁদের দুই প্রতিবেশী—‘লামিন’ এবং ‘ইয়ামাল’। এই ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে ইয়ামালের বাবা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তাঁর সন্তানের নামের অংশ হবেন এই দুই দয়ালু প্রতিবেশী। আরবি ভাষায় ‘লামিন’ শব্দের অর্থ ‘বিশ্বস্ত’ আর ‘ইয়ামাল’ শব্দের অর্থ ‘সৌন্দর্য’। পরবর্তীতে তাঁর অফিসিয়াল নাম রাখা হয় লামিন ইয়ামাল নাসরাউই এশানা। ফুটবল বিশ্বের কাছে তাঁর নাম শুধুই এক খেলোয়াড়ের পরিচয় নয়, বরং কঠিন দিনে পাশে থাকা দুই প্রতিবেশীর প্রতি কৃতজ্ঞতার এক আজীবন স্মারক।
মায়ের ফাস্ট-ফুড রেস্তোরাঁ ও প্রথম ফুটবলের ছোঁয়া FOX Sports
পাঁচ বছর বয়সে ইয়ামালের মা-বাবার বিচ্ছেদ ঘটে। মা শিলা এশানা তাঁকে নিয়ে চলে আসেন গ্রানোলিয়ার্স শহরে। ছেলেকে বড় করতে তিনি কাজ শুরু করেন এক ফাস্ট-ফুড রেস্তোরাঁয়। ভাগ্যিস তিনি সেই চাকরিটা পেয়েছিলেন! কারণ সেই রেস্তোরাঁতেই পরিচয় হয় স্থানীয় ‘সিএফ লা তোরেতা’ (CF La Torreta) ক্লাবের ইউথ কোঅর্ডিনেটরের মেয়ের সঙ্গে।
ছেলের খেলার অদম্য ইচ্ছে দেখেও মা চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন—ক্লাবের ফি দেওয়ার মতো টাকা যে তাঁর কাছে নেই! কিন্তু সেই কোঅর্ডিনেটর ইয়ামালের ভেতরের প্রতিভা চিনতে ভুল করেননি। তিনি সেদিন একবাক্যে বলেছিলেন, “ছেলেটি যদি সত্যিই খেলতে চায়, তবে টাকার অভাব কোনোদিন তার পথে বাধা হবে না।”
সেই প্রতিশ্রুতি ও লা মাসিয়ার রূপকথা Indiatimes
মা-বাবার কষ্ট দেখে ছোটবেলাই বুক বেঁধেছিলেন ইয়ামাল। মা-বাবাকে উদ্দেশ্য করে কিশোর ইয়ামাল বলেছিলেন:
“আপনারা যদি ভাবেন আমি বড় হয়ে সাধারণ কোনো চাকরি করব, তবে আমরা বড় সমস্যায় পড়ব! কিন্তু আমি যদি ফুটবলার হতে পারি, তবে কথা দিচ্ছি—আপনাদের আর জীবনের কোনোদিন চিন্তা করতে হবে না।”
কথা তিনি রেখেছেন। মাত্র সাত বছর বয়সে বার্সেলোনা তাঁদের বিখ্যাত অ্যাকাডেমি ‘লা মাসিয়া’য় তাঁকে ডেকে নেয়। আর ১৫ বছর বয়সে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক ঘটিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান তিনি।
‘৩০৪’ উদযাপনের রহস্য ও লিওনেল মেসির সেই ছবি Reddit
প্রতিটি গোল করার পর ইয়ামাল দুই হাতের আঙুল দিয়ে ‘৩০৪’ চিহ্ন তৈরি করে উদযাপন করেন। এটি কোনো সাধারণ সংখ্যা নয়; এটি তাঁর শৈশবের এলাকা কাতালুনিয়ার ‘রোকাফোন্দা’র পোস্টাল কোডের (08304) শেষ তিনটি ডিজিট। যে দরিদ্র পাড়ায় তিনি বড় হয়েছেন, যেখানে আজও তাঁর দাদি বাস করেন, সেই শেকড়কে সম্মান জানাতেই আন্তর্জাতিক ফুটবলের রাজমুকুটেও তিনি ফুটিয়ে তোলেন ‘৩০৪’।
আরও একটি অবিশ্বাস্য কাকতালীয় ঘটনা জড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের সঙ্গে। ২০০৭ সালে ইউনিসেফের এক দাতব্য ফটোশুটের জন্য বার্সেলোনার লা মাসিয়ায় এক শিশু ফুটবলার ও তাঁর মায়ের ছবি তোলা হয়েছিল। সেই ২০ বছর বয়সী তরুণের নাম ছিল লিওনেল মেসি, আর তাঁর কোলে চড়ে গোসল করা সেই চার মাসের ফুটফুটে শিশুটি ছিলেন আর কেউ নন—লামিন ইয়ামাল।
আজ কোটি কোটি ইউরোর তারকা হয়েও লামিন ইয়ামাল ভোলেননি তাঁর ফেলে আসা দিনগুলো। কোটি টাকার চাপকে তিনি স্রেফ আনন্দ হিসেবে নেন, কারণ সত্যিকারের সংগ্রামের মুখোমুখি তাঁর মা-বাবা অনেক আগেই হয়ে এসেছিলেন









