স্পোর্টস ডেস্ক: চলতি বিশ্বকাপে মাঠের ফুটবলের পাশাপাশি মাঠের বাইরের এক অভূতপূর্ব বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ম্যাচ অফিশিয়াল ও রেফারির মাধ্যমে আর্জেন্টিনাকে অন্যায্য সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলে টুর্নামেন্ট থেকে তাদের বহিষ্কারের দাবি উঠেছে। আর এই দাবি ঘিরে খোলা একটি অনলাইন পিটিশনে ইতিমধ্যে ৯৮ লাখের (৯.৮ মিলিয়ন) বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
তবে দলের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ ও পক্ষপাতিত্বের দাবি কড়া ভাষায় নাকচ করে দিয়েছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী কোচ লিওনেল স্কালোনি।
কী আছে সেই পিটিশনে?
‘আর্জেন্টিনা আউট ডটকম’ (argentinaout.com) নামক একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে এই পিটিশনটি খোলা হয়। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ফিফা এবং ম্যাচ কর্মকর্তারা টুর্নামেন্টজুড়ে আর্জেন্টিনা ও তাদের মহাতারকা অধিনায়ক লিওনেল মেসির প্রতি স্পষ্ট পক্ষপাতিত্ব দেখাচ্ছেন।
পিটিশনের বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়:
“বিজয়ী যদি আগেই নির্ধারিত থাকে, তাহলে অন্য দলগুলো কেন এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে? ফেয়ার প্লে-র স্বার্থে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করে বাকি সব দলকে সমান সুযোগ দেওয়া হোক।”
বিতর্কের সূত্রপাত: সেই রোমাঞ্চকর ‘মিশর’ ম্যাচ
এই বিতর্কের মূল বারুদ জ্বলেছে শেষ ষোলোর (রাউন্ড অফ সিক্সটিন) আর্জেন্টিনা বনাম মিশর ম্যাচটিকে কেন্দ্র করে। শ্বাসরুদ্ধকর সেই ম্যাচে প্রথমার্ধে লিওনেল মেসি পেনাল্টি মিস করার পর ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল আলবিসেলেস্তেরা। তবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের মতো ঘুরে দাঁড়িয়ে শেষ ১৩ মিনিটে নাটকীয়ভাবে ৩টি গোল করে ৩-২ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয় আর্জেন্টিনা।
কিন্তু ম্যাচের এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের পরই ক্ষোভে ফেটে পড়ে মিশর শিবির। তাদের অভিযোগ, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR)-এর মাধ্যমে প্রথমার্ধে মিশরের একটি বৈধ গোল বাতিল করা হয়। শুধু তাই নয়, আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের ঠিক আগের মুহূর্তে মিশরের তারকা ফরোয়ার্ড মোহাম্মদ সালাহকে বক্সের ভেতর ফাউল করা হলেও রেফারি তা ভিএআর-এ পর্যালোচনা করেননি। মিশরের দাবি, আর্জেন্টিনার সেই গোলটি বাতিল করে উল্টো মিশরকে পেনাল্টি দেওয়া উচিত ছিল।
“এটি সাজানো ম্যাচ”—মিশর কোচের তোপ
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে নিজের ক্ষোভ চেপে রাখতে পারেননি মিশরের কিংবদন্তি কোচ হোসাম হাসান। ফিফাকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তিনি বলেন,
“আমি পরিণতির কথা না ভেবেই বলছি—এটি একটি সাজানো ম্যাচ ছিল। যদি আর্জেন্টিনাকেই জেতাতে হয়, তাহলে অন্য দলগুলোকে বিশ্বকাপে আনার কী দরকার? ফিফা শুধু মেসিকে টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রাখতে চায়। তারা মুখে ‘ফেয়ার প্লে’র কথা বলে, কিন্তু আমরা মাঠে তার কোনো প্রমাণ দেখিনি।”
স্কালোনির কড়া জবাব: মনে করালেন ১৯৮৬ সালের ইতিহাস
কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে এসে মিশর কোচের এসব বিস্ফোরক অভিযোগ ও অনলাইন পিটিশনের বিষয়টি সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেন আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি। তার দাবি, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে পক্ষপাতিত্বের কোনো সুযোগ নেই, বরং এগুলো সবই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সস্তা রটনা।
যুক্তির খাতিরে স্কালোনি বলেন,
- প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ: বর্তমান ফুটবলে একাধিক ক্যামেরা ও ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির যুগে কোনো নির্দিষ্ট দলকে ইচ্ছাকৃতভাবে রেফারি বা ফিফা কর্তৃক অন্যায্য সুবিধা পাইয়ে দেওয়া কার্যত অসম্ভব। প্রতিটি সিদ্ধান্তই নিখুঁতভাবে মনিটর করা হয়।
- ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: সমালোচকদের খোঁচা দিয়ে স্কালোনি ইতিহাসের পাতা টেনে বলেন, “১৯৮৬ সালেও (যখন ডিয়েগো ম্যারাডোনার হাত ধরে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেছিল) বলা হয়েছিল আর্জেন্টিনা অন্যায্য সুবিধা পাচ্ছে। তাই আমাদের জন্য এই ধরণের সমালোচনা ও বিতর্ক একেবারেই নতুন কিছু নয়।”
ফুটবল মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের এই উত্তাপ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়িয়ে ফুটবল বোদ্ধাদের টেবিল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সালাহ-ভক্ত ও আর্জেন্টিনা-বিরোধীরা যেখানে এই পিটিশনকে সমর্থন দিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি করছেন, অন্যদিকে ফুটবল বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, আর্জেন্টিনার মতো বড় দলের বিপক্ষে এমন মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করতেই এই পিটিশনকে হাতিয়ার করা হচ্ছে। তবে পিটিশনে স্বাক্ষরকারীর সংখ্যা যেভাবে কোটির ঘরের দিকে এগোচ্ছে, তা চলতি বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম বড় অফ-ফিল্ড বিতর্ক হিসেবেই গণ্য হচ্ছে।









