স্পোর্টস ডেস্ক : চলতি বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট কেটেছে আর্জেন্টিনা। মাঠের চরম উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি গোল আর স্লেজিংয়ের রোমাঞ্চ ছাপিয়ে ম্যাচ শেষে এখন ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডের একটি পানির বোতল!
ম্যাচ শেষ হতেই ক্যামেরার লেন্স ঘুরে যায় ইংলিশ গোলরক্ষকের ফেলে যাওয়া সেই পানির বোতলের দিকে, যা আধুনিক ফুটবলের ডাটা অ্যানালাইসিস এবং ট্যাকটিকসের এক অদ্ভুত প্রামাণ্য দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যেভাবে ফাঁস হলো পিকফোর্ডের গোপন ‘চিরকুট’
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর যখন আলবিসেলেস্তেরা মাঠজুড়ে সমর্থকদের সঙ্গে উল্লাসে মাতোয়ারা, ঠিক তখনই ইংল্যান্ডের ডাগআউটের কাছ থেকে পিকফোর্ডের পানির বোতলটি কুড়িয়ে পান আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় ম্যাসাজ থেরাপিস্ট মার্সেলো ‘ড্যাডি’ ডি’আন্দ্রেয়া। বোতলটি হাতে নিতেই তার চোখ চড়কগাছ! বোতলের গায়ে সেঁটে দেওয়া একটি কাগজে নিখুঁত ছকে লেখা ছিল আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য পেনাল্টি শুটারদের নাম এবং তারা সাধারণত গোলপোস্টের কোন দিকে শট নেন, তার আদ্যোপান্ত।
টেলিভিশন ক্যামেরায় দেখা যায়, ডি’আন্দ্রেয়া বোতলটি নিয়ে সরাসরি চলে যান অধিনায়ক লিওনেল মেসি, নিকোলাস গঞ্জালেস ও মার্কোস সেনেসির কাছে। মেসি বেশ কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে সেই চিরকুটটি পড়েন এবং সতীর্থদের সঙ্গে হাসাহাসি ও আলোচনা করেন। ম্যাচটি যদি নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও অতিরিক্ত সময়ে অমীমাংসিত থেকে টাইব্রেকারে গড়াত, তবে এই ‘চিট শিট’ বা গোপন নোটটিই হতে পারত পিকফোর্ডের ট্রাম্প কার্ড।
নিজের নাম দেখে এনজোর হাসি, লুইসের পোস্ট
পিকফোর্ডের সেই গোপন তালিকায় শুধু মেসি বা গঞ্জালেস নন, নাম ছিল ম্যাচের অন্যতম গোলদাতা এনজো ফার্নান্দেজেরও। চিরকুটে নিজের নাম ও শট নেওয়ার প্রবণতার বিবরণ দেখে হাসিতে ফেটে পড়েন এই আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার। পরে আকাশের দিকে হাত তুলে ইশারা করে তিনি একপ্রকার স্বস্তিই প্রকাশ করেন—যাক বাবা, ম্যাচটা টাইব্রেকার পর্যন্ত গড়ায়নি!
পেনাল্টি অ্যানালাইসিস কী? আধুনিক ফুটবলে প্রতিপক্ষের পেনাল্টি নেওয়ার কৌশল বিশ্লেষণ করা একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। গোলরক্ষকরা প্রায়ই বোতলে বা তোয়ালেতে এমন নোট রাখেন। এর আগে ২০১৮ বিশ্বকাপ ও ২০২১ ইউরোতেও জর্ডান পিকফোর্ডকে এমন কৌশল ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছিল। তবে ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের হাতে সেই গোপন নোট চলে আসার ঘটনা বেশ বিরল।
পরবর্তীতে আর্জেন্টিনার ফিটনেস কোচ লুইস মার্তিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই বোতলের নোটটির একটি স্পষ্ট ছবি শেয়ার করেন। সেখানে দেখা যায়, ইংলিশ কোচিং স্টাফ ও অ্যানালিস্টরা কতটা নিখুঁতভাবে প্রতিটি আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়ের পেনাল্টি নেওয়ার ধরন বিশ্লেষণ করে পিকফোর্ডকে হোমওয়ার্ক করিয়ে মাঠে নামিয়েছিলেন।
মাঠের উত্তেজনা ও দ্বৈরথ
ম্যাচটি শুধু কৌশলের লড়াই ছিল না, ছিল চরম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও। প্রথমার্ধে ইংল্যান্ডের অ্যান্থনি গর্ডন গোল করার পর গোলরক্ষক পিকফোর্ড আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের দিকে তাকিয়ে বেশ উগ্র ও বিতর্কিত ভঙ্গিতে উদযাপন করেন। তবে আলবিসেলেস্তেরা সমতায় ফেরার পর তার মোক্ষম জবাব দেন ডিফেন্ডার ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। পিকফোর্ডের মুখের সামনে গিয়েই চিৎকার করে উল্লাস করেন এই ডিফেন্ডার। পুরো ম্যাচজুড়েই দুই দলের ফুটবলারদের মধ্যে কয়েক দফা ধাক্কাধাক্কি ও বাক্যবিনিময়ের ঘটনা ঘটে।
ফুটবল মহলে নতুন বিতর্ক
ম্যাচ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বোতলের ছবি হু হু করে ভাইরাল হয়ে যায়। ফুটবল বোদ্ধাদের মতে, ডাটা ও প্রযুক্তির যুগে পেনাল্টি ট্র্যাক করা কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি পেশাদারিত্বের অংশ। তবে মাঠের ভেতরেই এভাবে চিরকুট ফাঁস হয়ে যাওয়া এবং তা নিয়ে বিজয়ীদের ট্রল করার ঘটনাটি চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা মূহুর্ত হিসেবে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে।
ইংল্যান্ডকে বিদায় করে ফাইনালের মঞ্চে পা রাখা আর্জেন্টিনার সামনে এখন বিশ্বজয়ের হাতছানি, আর ইংলিশদের জন্য বিদায়ের বেদনার সঙ্গে যোগ হলো এই ‘বোতল-রহস্যের’ অস্বস্তি।









