• রাজশাহী, বাংলাদেশ
  • অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • asthanews.raj@gmail.com
  • +880-1711-294327

বাবার স্বপ্ন পূরণ আর মা-কে বাঁচানোর যুদ্ধ: এক হাতে বই, অন্য হাতে বাদামের ঝুড়ি ৮ বছরের মাহিমের

প্রকাশ: Friday, 31st July, 2026 10:59
আপডেট: Friday, 31st July, 2026 10:59

বাবার স্বপ্ন পূরণ আর মা-কে বাঁচানোর যুদ্ধ: এক হাতে বই, অন্য হাতে বাদামের ঝুড়ি ৮ বছরের মাহিমের

বিশেষ প্রতিনিধি, মেহেরপুর: স্কুলের ছুটির ঘণ্টা বাজতেই চারপাশের সহপাঠীদের মধ্যে বাঁধভাঙা উল্লাস। কেউ ছুটে যাচ্ছে ফুটবল মাঠের দিকে, কেউবা মেতে উঠছে দড়ি লাফ বা কানামাছিতে। পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে যখন শৈশবের চঞ্চলতা, তখন ৮ বছরের শিশু মাহিমের চোখ দুটি অন্য জায়গায়। সহপাঠীদের দূর থেকে খেলাধুলা করতে দেখলেও তার খেলার সুযোগ নেই। ব্যাগটি কাঁধে ঝুলিয়ে, হাতে বাদামের ঝুড়ি আর ছোট্ট সাইকেলটি চেপে সে বেরিয়ে পড়ে বাদাম বিক্রির উদ্দেশ্যে।

মেহেরপুর সদর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের গ্যাজাল পাড়ার মৃত আব্দুল মান্নানের ছেলে মাহিম। সে স্থানীয় ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। মাত্র আট বছর বয়সেই যার হাতে থাকার কথা ছিল রঙ-পেন্সিল আর খেলার খেলনা, সেই বয়সেই তার কাঁধে চেপে বসেছে পুরো পরিবারের ভার।

এক মৃত্যুর পর আরেক ট্র্যাজেডি, থমকে যাওয়া পরিবার মাহিমের পরিবারসূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২০ বছর আগে পানিতে ডুবে প্রাণ হারায় মাহিমের এক ভাই। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই দেড় বছর আগে হৃদরোগে (স্ট্রোক) আক্রান্ত হয়ে মারা যান বাবা আব্দুল মান্নান। বড় বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে মা শিল্পী খাতুন ও ছোট বোনকে নিয়েই মাহিমের সংসার। উপার্জনক্ষম কোনো পুরুষ না থাকায় পরিবারের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায় এই ছোট্ট শিশুটি।

প্রতিদিন ভোরে সূর্য ওঠার আগেই ঘুম ভাঙে মাহিমের মা শিল্পী খাতুনের। চুলায় কড়াই বসিয়ে ছেলের জন্য ভেজে দেন প্রায় ৫০ প্যাকেট বাদাম। মাহিম সেই বাদামের প্যাকেট নিয়ে স্কুলের পোশাক পরেই সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যায়। ক্লাসের ফাঁকে কিংবা টিফিনের সময়েও তাকে দেখা যায় বাদাম হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে। ছুটির পর বাড়ি না ফিরে সে শহর ও গ্রামের অলিগলিতে বাদাম বিক্রি করতে থাকে। রাত অবধি বাদাম বিক্রি শেষে যা আয় হয়, তা দিয়েই মেটে তাদের প্রতিদিনের চাল-ডালের খরচ।

প্রতিকূল আবহাওয়া ও মায়ের উৎকণ্ঠা গ্রীষ্মের তাপদাহ কিংবা বর্ষার ঝুম বৃষ্টি—কোনো কিছুই মাহিমকে থামাতে পারে না। তবে সম্প্রতি টানা বৃষ্টিতে ভিজে বাদাম বিক্রি করতে গিয়ে জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে সে। অসুস্থ শরীর নিয়েও সংসারের প্রয়োজনে তাকে আবার রাস্তায় নামতে হচ্ছে।

বাড়িতে বসে পথ চেয়ে থাকা মা শিল্পী খাতুন চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, “যে বয়সে আমার ছেলে স্কুল শেষে এসে বন্ধুদের সাথে খেলবে, সেই বয়সে তাকে সংসারের জন্য পথে পথে ঘুরতে হচ্ছে। মা হিসেবে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে? অভাব আমাদের সব কেড়ে নিয়েছে। বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর আসলেও ও ঘরে থাকতে পারে না, বাদাম বিক্রি না করলে যে হাড়ি জ্বলবে না!”

সহপাঠী ও শিক্ষকদের চোখে মাহিম স্কুলে মাহিম অত্যন্ত মনোযোগী ও মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত। তার সহপাঠীরা জানায়, ক্লাস চলাকালে মাহিম খুবই হাসি-খুশি থাকে এবং শিক্ষকের পড়া সহজেই বুঝে নেয়। তবে ছুটির পর যখন সবাই একসাথে খেলতে চায়, তখন মাহিমকে চলে যেতে দেখে তাদেরও মন খারাপ হয়।

ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “মাহিম অত্যন্ত মেধাবী ও নিয়মিত শিক্ষার্থী। বাবার মৃত্যুর পর থেকে পরিবারটির করুণ অবস্থা আমরা দেখছি। স্কুল থেকে তার পড়াশোনা যাতে বন্ধ না হয়, সেজন্য বই, খাতা, কলমসহ সম্ভাব্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা আমরা দিচ্ছি। তবে একটি পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটাতে আরও বড় সহযোগিতার প্রয়োজন।”

সরকারি ও সামাজিক উদ্যোগের আশ্বাস মাহিমের এই জীবনসংগ্রামের খবর স্থানীয়দের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। মেহেরপুর সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান এ বিষয়ে জানান, “ঘটনাটি অত্যন্ত মানবিক। আগামী আগস্ট মাসের শেষ নাগাদ মাহিমের মায়ের জন্য বিধবা ভাতার কার্ডের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি, ইউনিসেফের কর্মসূচির আওতায় ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশু হিসেবে মাহিমকে শিক্ষাবৃত্তির আওতায় আনার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”

মাহিমের একটাই স্বপ্ন—পড়াশোনা করে বড় হওয়া, বাবার মতো কষ্টে জীবন পার না করা। চরম অনিশ্চয়তা ও অভাবের মাঝেও এক হাতে বই-খাতা আর অন্য হাতে বাদামের প্যাকেট নিয়ে প্রতিদিন নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার তাগিদেই এগিয়ে চলেছে এই খুদে যোদ্ধা।



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কাজী জহুরুল আলম ।। প্রকাশকঃ মিজানুর রহম্যান মিজান

রাজশাহী অফিস: চারঘাট, জিপিও-৬২৭০, রাজশাহী।
ই-মেইল: asthanews.raj@gmail.com, মোবাইল: +880-1711-294327